সরকার

JamunaTV



সরকার: নীতি, কার্যক্রম ও জনপ্রত্যাশার বাস্তব চিত্র

একটি রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সরকার দেশের প্রশাসন, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব খাতে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তর আলোচনা চলছে।

সরকারের কাঠামো ও দায়িত্ব

বাংলাদেশ সরকার মূলত নির্বাহী বিভাগ হিসেবে কাজ করে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় মাঠপর্যায়ে।

সরকারের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—

আইন বাস্তবায়ন ও প্রশাসন পরিচালনা

অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বাজেট বাস্তবায়ন

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা

জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা

এই দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালনের ওপরই সরকারের কার্যকারিতা নির্ভর করে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বাজেট

সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ভর্তুকি, আমদানি নীতি ও বাজার তদারকি জোরদার করেছে। তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

উন্নয়ন প্রকল্প ও বাস্তবায়ন

সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও রেল খাতে বড় প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

তবে অনেক প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে—এমন মত বিশেষজ্ঞদের।

প্রশাসন ও জনসেবা

সরকারি প্রশাসনের দক্ষতা সরাসরি জনসেবার মানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ডিজিটাল সেবা চালুর ফলে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভূমি সেবা ও বিভিন্ন আবেদন প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি, হয়রানি ও সেবাপ্রাপ্তিতে বিলম্বের অভিযোগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। প্রশাসনিক সংস্কার ও কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের।

আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ দমনে সাফল্য এলেও ছিনতাই, মাদক ও সাইবার অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান নয়—দ্রুত বিচার ও আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সামাজিক খাত ও জনকল্যাণ

সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি লাখো মানুষের জীবনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

তবে এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ডিজিটাল ডাটাবেজ ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করলে এই খাতে আরও উন্নতি সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের সমালোচনা ও জবাবদিহিতা

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সরকারের নীতিনির্ধারণ ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই সমালোচনার মাধ্যমে নীতি সংশোধন ও উন্নতির সুযোগ তৈরি হয়।

তবে সমালোচনা গ্রহণে সহনশীলতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে—এমন মত বিশ্লেষকদের।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

বাংলাদেশ সরকারের সামনে সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে—

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

কর্মসংস্থান সৃষ্টি

সুশাসন ও দুর্নীতি দমন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা

ডিজিটাল ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

উপসংহার

সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সরকার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। সরকার, প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব—এটাই আজকের জাতীয় বাস্তবতা।