আইন ও বিচার

JamunaTV

 



দেশে অপরাধ পরিস্থিতি: কারণ, প্রভাব ও প্রতিরোধে করণীয়

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। খুন, ছিনতাই, চুরি, মাদক কারবার, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়মিতভাবে সংবাদ শিরোনামে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সত্ত্বেও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের সঙ্গে অপরাধ বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
অপরাধের ধরন ও বর্তমান চিত্র
দেশে সংঘটিত অপরাধের মধ্যে চুরি ও ছিনতাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মোবাইল ফোন, টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণপরিবহন, ব্যস্ত সড়ক এবং জনবহুল এলাকাগুলোতে এসব অপরাধ বেশি সংঘটিত হচ্ছে।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা ও জমি সংক্রান্ত বিরোধে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে মানুষ, যা সামাজিক সহনশীলতার অভাবকেই তুলে ধরে।
নারী ও শিশু নির্যাতন
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ দেশের অপরাধ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা সমাজকে নাড়া দিচ্ছে। অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক চাপ ও ভয়ভীতির কারণে অভিযোগ করতে সাহস পান না, ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার না ঘটলে এই ধরনের অপরাধ কমানো কঠিন হবে।
মাদক ও কিশোর অপরাধ
মাদকাসক্তি বর্তমানে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদক সংগ্রহের জন্য অনেকেই চুরি, ছিনতাই কিংবা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
কিশোর অপরাধও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষার প্রতি অনীহা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
সাইবার অপরাধের বিস্তার
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধও বাড়ছে। ফেসবুক হ্যাকিং, অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া লিংক দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। অনেক সাধারণ মানুষ এসব প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষ ইউনিট গঠন করলেও সচেতনতার অভাবে অপরাধীরা এখনো সুযোগ নিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
অপরাধ দমনে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্বল তদন্তের কারণে শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে না—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে শুধু গ্রেপ্তার নয়, বরং সঠিক তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
অপরাধ বৃদ্ধির পেছনের কারণ
অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, পারিবারিক ভাঙন ও নৈতিক অবক্ষয় বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।
অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার অপরাধীদের রক্ষা করছে বলেও অভিযোগ উঠছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে।
প্রতিরোধে করণীয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—
আইনের কঠোর ও সমান প্রয়োগ
দ্রুত বিচার ব্যবস্থা কার্যকর করা
মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
একই সঙ্গে নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য।
উপসংহার
অপরাধ একটি সমাজের গভীর সমস্যার প্রতিফলন। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি—তিন পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই অপরাধমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব। নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে আইনের শাসন, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।