কৃষি

JamunaTV

 



কৃষি খাত: বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার চিত্র

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষি খাত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা এখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তার ফলে উৎপাদন বাড়লেও জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য সংকট কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা

বাংলাদেশ ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও মাছ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উন্নত বীজ, সেচ ব্যবস্থা ও সার ব্যবহারের ফলে এক ফসলি জমি এখন দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।

তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা উৎপাদনে ঝুঁকি তৈরি করছে। বন্যা, খরা ও অতিবৃষ্টি অনেক সময় ফসলের বড় ক্ষতি করছে, যা কৃষকদের জন্য মারাত্মক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।

কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি

সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ খরচ বৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক কৃষক অভিযোগ করছেন, ফসল উৎপাদনের সময় তারা উচ্চমূল্যে উপকরণ কিনলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে মাঠপর্যায়ে এই সুবিধা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কিনা—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কৃষি খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না, অথচ ভোক্তাকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি কৃষক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার ও হিমাগার বাড়ানো এবং কৃষি বিপণন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।

প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষি

প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকরা আবহাওয়া, বাজারদর ও রোগবালাই সম্পর্কে তথ্য পাচ্ছেন। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কম সময়ে বেশি জমি চাষ সম্ভব হচ্ছে।

ডিজিটাল কৃষি সেবার বিস্তার হলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে—এমন আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষির জন্য বড় হুমকি। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড় নিয়মিতভাবে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক কৃষক চাষাবাদ ছেড়ে বিকল্প পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

জলবায়ু সহনশীল ফসল, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতি সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছেন গবেষকরা।

কৃষক ও আর্থিক সহায়তা

কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কৃষক এখনও উচ্চ সুদের মহাজনী ঋণের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের আর্থিক সংকট বাড়িয়ে দেয়।

সরকার কৃষি ঋণ ও প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করলেও মাঠপর্যায়ে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।

তরুণদের কৃষিতে আগ্রহ

বর্তমানে অনেক তরুণ কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। শহরমুখী প্রবণতার ফলে গ্রামে শ্রম সংকট দেখা দিচ্ছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা কৃষি ও আগ্রো-বিজনেস তরুণদের নতুন করে আকৃষ্ট করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়

বাংলাদেশের কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন—

ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কার

জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ

প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ

কৃষি ঋণ সহজলভ্য করা

গবেষণা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা

উপসংহার

কৃষি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড। চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও কৃষকবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করলে কৃষি খাত আরও শক্তিশালী হবে। কৃষকের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাই পারে একটি স্বনির্ভর ও টেকসই বাংলাদেশের পথ সুগম করতে—এটাই আজকের বাস্তবতা।