রমজান ২০২৬: কবে শুরু হচ্ছে পবিত্র মাস, প্রথম রোজা কবে, সেহরি–ইফতারের সময়, কী করা যাবে আর কী করা যাবে না
নিজস্ব প্রতিবেদক: মুসলমানদের জন্য রমজান মাস শুধু উপবাসের সময় নয়, এটি আত্মসংযম, ইবাদত, ত্যাগ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। বছর ঘুরে আবারও আসছে পবিত্র মাহে রমজান। ২০২৬ সালে রমজান কবে শুরু হবে, কোন তারিখে প্রথম রোজা, সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি, রমজানে কী করা উচিত এবং কী করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন—এসব বিষয় নিয়েই আমাদের আজকের বিস্তারিত প্রতিবেদন।
২০২৬ সালে রমজান কবে শুরু হতে পারে?
ইসলামি হিজরি ক্যালেন্ডার চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় রমজান মাসের নির্দিষ্ট তারিখ আগেভাগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে পারে মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি অথবা বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একদিন আগে বা পরে রোজা শুরু হতে পারে।
বাংলাদেশ, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শাবান মাসের চাঁদ দেখা গেলে, পরদিন অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রথম রোজা হতে পারে। অন্যথায় ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রথম রোজা ও সম্ভাব্য ঈদুল ফিতর ২০২৬
যদি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে রমজান শুরু হয়, তাহলে ৩০ রোজা পূর্ণ হলে সম্ভাব্য ঈদুল ফিতর হতে পারে ১৯ অথবা ২০ মার্চ ২০২৬। তবে ২৯ রোজা হলে ঈদ একদিন আগেও হতে পারে। সবকিছু নির্ভর করবে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার ওপর।
রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত
রমজান মাসকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এই মাসেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“রমজান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াত হিসেবে।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)
এই মাসে একটি নফল ইবাদত ফরজের সমান সওয়াবের অধিকারী হয় এবং একটি ফরজ ইবাদতের সওয়াব অন্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান হয়ে যায়—এমন বর্ণনাও হাদিসে পাওয়া যায়।
রমজানে রোজার বিধান
সাবালক, সুস্থ মুসলমান নর-নারীর জন্য রমজানের রোজা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)
তবে অসুস্থ ব্যক্তি, মুসাফির, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীদের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে। তারা পরে সুবিধামতো রোজা কাজা করতে পারবেন।
সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি (বাংলাদেশ)
২০২৬ সালে রমজানের শুরুতে বাংলাদেশে আনুমানিক সেহরির শেষ সময় হতে পারে ভোর ৫টা ১০ মিনিটের মধ্যে এবং ইফতার হতে পারে সন্ধ্যা ৬টা ০৫ মিনিটের দিকে।
রমজান যত এগোবে, সেহরির সময় আরও কমবে এবং ইফতারের সময় ধীরে ধীরে বাড়বে। প্রতিদিন নির্ভরযোগ্য রোজার ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা উচিত।
রমজানে কী কী করা উচিত
- সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা
- বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা
- তারাবির নামাজ নিয়মিত পড়া
- ইফতারের আগে দোয়া করা
- গরিব-দুঃখীদের দান-সদকা করা
- মিথ্যা, গিবত ও খারাপ কথা থেকে বিরত থাকা
- আত্মসংযম ও ধৈর্য ধারণ করা
রমজানে কী কী করা যাবে না
রমজান মাসে কিছু কাজ করলে রোজা ভেঙে যায় এবং গুনাহ হয়। যেমন—
- ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার বা পানি গ্রহণ করা
- ধূমপান করা
- ইচ্ছাকৃত বমি করা
- যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা
- অশ্লীল কথা বা কাজ করা
- মিথ্যা বলা ও প্রতারণা করা
ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙলে কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হয়, যা অত্যন্ত কঠিন।
তারাবির নামাজের গুরুত্ব
রমজানের বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। রাসুল (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (বুখারি, মুসলিম)
লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত
রমজানের শেষ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদর। এই রাতে ইবাদত করা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। সাধারণভাবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ রমজানের বিজোড় রাতগুলোতে এই রাত তালাশ করতে বলা হয়েছে।
রমজানে দান ও যাকাতের গুরুত্ব
রমজান মাস দান-সদকার জন্য সর্বোত্তম সময়। এ মাসে যাকাত আদায় করলে গুনাহ মাফ ও সম্পদ পবিত্র হয়। অনেক মুসলমান এই মাসেই যাকাত ও ফিতরা আদায় করে থাকেন।
রমজানে স্বাস্থ্য সচেতনতা
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই সেহরিতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ইফতারে অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার পরিহার করা জরুরি।
রমজান মুসলিম সমাজে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
রমজান মুসলিম সমাজকে শৃঙ্খলা, সহানুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধ শেখায়। ধনী-গরিব সবাই একই নিয়মে রোজা রাখে, যা সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি করে।
উপসংহার
রমজান ২০২৬ মুসলমানদের জন্য আবারও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ নিয়ে আসছে। এই মাসে বেশি বেশি ইবাদত, সংযম ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সঠিকভাবে রোজা রাখা, সময়মতো নামাজ আদায় এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকলে রমজান আমাদের জীবন বদলে দিতে পারে।
নোট: রমজান ও ঈদের চূড়ান্ত তারিখ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। তাই জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
