দেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ বিনিয়োগকারী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। কখনো হঠাৎ উত্থান, আবার কখনো টানা দরপতন—এই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই চলছে পুঁজিবাজার। সাম্প্রতিক সময়ে সূচকের ওঠানামা, লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট শেয়ারবাজারের বর্তমান চিত্রকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জসহ দেশের প্রধান শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে মিশ্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো দিন সূচক সামান্য বাড়লেও পরদিনই বড় পতন দেখা যায়। লেনদেনের পরিমাণ প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় বাজারে প্রাণচাঞ্চল্য কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে অনেকেই বাজারের বাইরে অবস্থান করছেন।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট
শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে। অতীতের বাজার ধস, কারসাজি ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ফলে নতুন বিনিয়োগ আসতে সময় লাগছে।
অনেক বিনিয়োগকারীর অভিযোগ, বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ভালো কোম্পানির পাশাপাশি দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারও একইভাবে লেনদেন হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব
সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি শেয়ারবাজারে পড়ছে। মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে করপোরেট আয় কমছে। এতে কোম্পানিগুলোর মুনাফা প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় শেয়ারের দরও চাপের মুখে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা না এলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা কঠিন।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ভূমিকা
শেয়ারবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। অনেক ব্যাংক শেয়ারের দর দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী থাকায় বিনিয়োগকারীরা হতাশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী না হলে শেয়ারবাজারে স্থায়ী গতি আসবে না।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন সময়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সার্কিট ব্রেকার, শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ও মনিটরিং জোরদারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে বাজার সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করেন, স্বল্পমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
কারসাজি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন
শেয়ারবাজারে কারসাজি নতুন নয়। কোনো কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি ও পতন বিনিয়োগকারীদের সন্দেহ বাড়িয়েছে। স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ ও করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার না হলে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, শক্ত নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ
শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি ও বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় না হলে বাজার গভীরতা পায় না।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
সাধারণ বিনিয়োগকারীর করণীয়
বিশেষজ্ঞরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কোম্পানির মৌলভিত্তি, আয়, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করাই নিরাপদ।
দ্রুত লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি বলে তারা মনে করেন।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেন
শেয়ারবাজারে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। অনলাইন ট্রেডিং, মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহ বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা তৈরি করেছে। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়ন বাজারে স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
